জাত কেউটের মতই জাত লেখক ছিলেন অনিল ঘড়াই। জাতে কিন্তু ছিলেন হাড়ি। অন্ত্যজ, ব্রাত্য, দলিত। অতি দলিত। কিন্তু দলিত জীবনের কোনো হীনমণ্যতা তাঁকে কোথাও স্পর্শ করতে পারেনি। অন্ত্যজ জীবনের সমাজবাস্তবকে তুলে ধরতে তিনি আমার মতে অনেক বড় বড় বাংলা লেখকের তুলনায় অনেক বেশি ক্ষমতার পরিচয় দিয়েছেন তাঁর প্রতিটি লেখায় বিশেষকরে ছোটগল্পে।পরিযান প্রমাণ।
যা ছিলেন

যা হয়েছিলেন

জাত কেউটের মতই জাত লেখক ছিলেন অনিল ঘড়াই (renowned novelist Anil gharai,)।

জাতে কিন্তু ছিলেন হাড়ি। অন্ত্যজ,ব্রাত্য,দলিত। অতি দলিত। কিন্তু দলিত জীবনের কোনো হীনমণ্যতা তাঁকে কোথাও স্পর্শ করতে পারেনি। অন্ত্যজ জীবনের সমাজবাস্তবকে তুলে ধরতে তিনি আমার মতে অনেক বড় বড় বাংলা লেখকের তুলনায় অনেক বেশি ক্ষমতার পরিচয় দিয়েছেন তাঁর প্রতিটি লেখায় বিশেষকরে ছোটগল্পে।

সাতের দশকের যে শক্তিমান লেখকদের কথা বাজারি লেখায় ছয়লাপ বাংলা সাহিত্যভুলে যেতে চলেছে, অভিজিত সেনগুপ্ত, শৈবাল মিত্র, অমর মিত্র, ভগীরথ মিশ্রদের সেই প্রজন্মের লেখদের সমকক্ষ ছিলেন অনিল ঘড়াই।

অতি আফসোসের সঙ্গ লিখতে হচ্ছে যে বাংলা তাঁকে তাঁর প্রাপ্য সম্মানটুকু থেকে বন্চিত করল। টুকরো খবরে এবং কলকাতার কচড়ায় নামমাত্র উল্লেখ করে ষাটটির বেশি বইয়ের লেখকে সম্মান জানানো হল।

অন্ত্যজ জীবনের রূপকার বরেণ্য কথাশিল্পী অনিল ঘড়াই আর নেই। বিগত 23 শে নভেম্বরে কলকাতার এক নার্সিংহোমে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর বয়স হয়েছিল ৫৭ বছর।

নদিয়ার কালীগঞ্জের আদি বাড়িতে তাঁর শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়েছে।

তারপর কোনো লেখা তাঁকে নিয়ে আমার চোখে পড়েনি।

আশা করব অন্ততঃ বাংলা লিটিল ম্যাগ তাঁকে স্মরণ করবে এবং বইমেলায় হয়ত আমরা কিছু লেখায় অনিল ঘড়াই ও তাঁর সমকালকে আবার ফিরে দেখতে পারব।

অনিলের মত আমি ক্ষমতাবান বাংলা লেখক নই।উদ্বাস্তুর ছেলে। পড়াশুনা হিন্দিতে বা ইংরাজিতে। হিন্দি কাগজে কাজ করি। লেখালেখি ইংরেজিতে করার অভ্যাস আছে।

লেখা আমার পিতৃদায়,যেহেতু তিনি সারা ভারতে অন্তযজ উদ্বাস্তুদের নিয়ে সারা জীবন লড়াই চালিয়ে গিয়েছেন এবং বাংলার বাইরের বাঙালিদের নিয়ে বাঙালির আদৌ কোনো মাথাব্যথা নেই।তাই আমায় মাঝে মাঝে বাংলা লেখার চেষ্টা করতে হয়।

বাংলায় লেখা অনিলের বরং জলভাত ছিল। ব্যাপক ছিল তাঁর পাঠক সমাজ এবং যত্ন করেই তাঁর বই প্রকাশকরা ছাপতেন। বাংলায় কোনো ভাষাতেই আমার লেখা ছাপা হয় না। কোনো দিনও হবে না।

তবু অনিল ঘড়াইকে নিয়ে একটি অতি দীর্গ লেখা বহুকাল আগে লিখেছিলাম।সুস্নাত জানা সমাপাদিত বইয়ের জন্য। অনিল ঘড়াই বিশেষ করে আমায় লিখতে বলেছিলেন। জানি না,আদৌ সে লেখা ছাপা হল কিনা।লেখার পর আমি আগামী লেখায় চলে যাই।আগের লেখা ছাপা হল কিনা খোঁজ করিনা।

ঔ লেখায় তাঁর পরিযান বইখানির সব গল্প নিয়ে লিখেছিলাম।

আমি তারাশন্করের বিখ্যাত সব বই পড়েছি,পড়েছি মাণিক বন্দোপাধ্যায়ও, যাদের লেখায় অন্ত্যজ জীবনের ইতিকথা লেখা আছে বলে দাবি করা হয়। সেখানে অন্ত্যজ জীবনের যৌণতার বিবরণ অনেক মিললেও তাঁদের জীবন জীবিকার খুঁটিনাটি অনুপস্থিত বলেই আমার মনে হয়েছে।সচেতন প্রচেষ্টা সত্বেও প্রামাণিকতার অভাব মনে হয়েছে ছত্রে ছত্রে।

অনিল ঘাড়াইয়ের লেখায় কিন্তু সেই সমাজবাস্তব ছিল যা আমি বাংলাদেশি লেখকদের লেখায় দেখতে পাই।

কিন্তু নবারুণদা অন্ত্যনা হয়েও, পা থেকে মাথাপর্যন্ত আগাগোড়া আরবন হয়েও অন্ত্যজ ও ব্রাত্যজীবনের যে সংগ্রামকে ভাষা দিতে পেরেছেন.সেটা অনিলের লেখাতেও পাইনি। আসলে সেই লড়াইয়ে অনিল ছিলেনই না কোথাও,তাঁর সমাজবাস্তবের দৃষ্টিপাত তাই আমাকে তাঁর কাছ থেকে দুরে সরিয়ে রেখেছে।

১৯৯৪ সালে দলিত সাহিত্যের জন্য রাষ্ট্রপতির হাত থেকে পেয়েছিলেন সংস্কৃতি পুরস্কার।বাংলা দলিত সাহিত্য আন্দোলনও তাঁকে পুরস্কৃত করেছিল, বোধহয় 2002 সালে।কাঁথিতে সেই বাংলা দলিত সাহিত্য সম্মেলনে আমি প্রথম ও শেষবার গিয়েছিলাম। তারপর বইমেলা ছাড়াও কোলকাতায় অনেক অনুষ্ঠানে দেখা হয়েছে।কিন্তু সেই শেষ।

দলিত সাহিত্য সম্মেলনে রাজনৈতিক দলাদলি দেখে আমার আর ওদের সঙ্গে ওঠা বসা হয়নি এবং কোনো কালই দলিত সাহিত্যকি হিসাবে চিন্হিত হতে চাননি অনিল ঘড়াইও।

আমার এখনো আশ্চর্যা হয় যে কোন যে তাঁকে সেবার পুরস্কার দেওয়া হল এবং কানই বা তিনি নিতে গেলেন।তিনি ত মেইন স্ট্রিমের লিখক হতে সাদ্যমত চেষ্টা করেছিলেন এবং তাঁ বড় লেখক হয়ে ওঠার যথেষ্টই সম্ভাবনা ছিল।

আমি নাগরিকত্ব সংশোধণী আইন পাশ হওয়ার পর থেকে কোলকাতায় সেই 2003 সাল থেকে কোথাও বইমেলা বা অন্য কোনো অনুষ্ঠানে যাইনা।মাঝে ভাষাবন্ধনে যুক্ত থাকার জন্য হয়ত একাধবার গিয়েছি।

তাই অনিল ঘড়াইয়ের কোনো সংবাদ আমি জানতাম না। কয়েক মাসের বন্ধুত্বের জন্য তাঁকে প্রিয় বন্ধু লিখলাম,জানিনা সে অধিকার আমার আছে কিনা।

তাঁর প্রয়াত হওয়ার খবরও ঔ টুকরো খবর থেকে জানা। আমাকে কেউ জানাননি।কত লোক জনতে পেরেছেন,তাঁর পাঠকদের সবাই জানেন কিনা ধন্দে আছি।

তাই অন্ততঃ বাংলার বািরের পাঠকদের জন্য এই লেখার প্রয়োজন মনে হয়েছে।বাংলায় অনিলের অনেক বন্ধু আছেন, যারা আশা করি ভালোভাবে সময়মত অনিলকে স্মরণ করবেন এবং অবশ্যই তিনি তাঁর প্রাপ্যসম্মান থেকে বন্চিত হবেন না৷‌

অনিল ঘড়াইয়ের জন্ম ১৯৫৭ সালে মেদিনীপুর জেলার এগরা থানার অম্তর্গত রুশিতাংশণীপুর গ্রামে৷‌ তাঁর শৈশব, কৈশোর ও যৌবনের অনেকটা সময় কেটেছে নদীয়া জেলার কালীগঞ্জে৷‌

পিতা অভিমন্যু ঘড়াই ও মাতা তিলোত্তমা ঘড়াই।

মৃত্যুকালে বয়স হয়েছিল ৫৭ বছর৷‌

রেখে গেছেন দুই মেয়ে ও স্ত্রীকে৷‌

নদিয়ার কালীগঞ্জের আদি বাড়িতে তাঁর শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়েছে।

গত ৮ মাস ধরে কিডনি জনিত সমস্যায় ভুগছিলেন এই সাহিত্যিক। তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধু আর এক সাহিত্যিক নন্দদুলাল রায়চৌধুরী বলেন, “সাহিত্য-সংস্কৃতির বড় ক্ষতি হয়ে গেল।”

২৭ বছর বয়সে চক্রধরপুরে রেলের ইঞ্জিনিয়ার পদে যোগ দেন তিনি। ১৯৮৫ সালে খড়্গপুর রেল বিভাগে বদলি হন। ১৯৯০ সালে তাঁর প্রথম ছোটগল্প প্রকাশ হয় ‘দেশ’ পত্রিকায়। নদিয়ার রাজোয়াড় বিদ্রোহ নিয়ে লেখা উপন্যাস ‘অনন্ত দ্রাঘিমা’ ২০১০ সালে বঙ্কিম স্মৃতি পুরস্কার পায়। ১৯৯৪ সালে দলিত সাহিত্যের জন্য রাষ্ট্রপতির হাত থেকে পেয়েছিলেন সংস্কৃতি পুরস্কার।

তাঁর নুনবাড়ি, আকাশ মাটির খেলা, কাক, পরিযান-সহ বহু লেখা সাহিত্যপ্রেমী মনে রেখেছেন। রেলশহরের কবি-সাহিত্যিকদের নিয়ে তিনি গড়েছিলেন ‘ঘরোয়া সাহিত্য বাসর’।

কৃষ্ণনগর কলেজ থেকে ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ডিপ্লোমা করেন। দক্ষিণ-পূর্ব রেলওয়েতে আধিকারিক হিসেবে চাকরি করতেন। চাকরিসূত্রে চক্রধরপুর ও পরে খড়্‌গপুরে বসবাস করতেন।

তাঁর প্রথম গল্পগ্রন্থ কাক এবং প্রথম উপন্যাস নুনবাড়্থি। তার গল্প, উপন্যাস ও কবিতা মিলিয়ে গ্রন্থের সংখ্যা পঞ্চাশেরও বেশি। অনিল ঘড়াইয়ের সাহিত্যের মূল সম্পদ দলিত, নিম্নবিত্ত ও শ্রমজীবী মানুষের জীবনচর্যা। নদীয়া ও মেদিনীপুরের গ্রামীণ মানুষ ও তাদের কথ্যভাষা যেমন উঠে এসেছে তাঁর রচনায়, তেমনি চক্রধরপুরে বসবাস করার সুবাদে সিংভূম অঞ্চলের কথ্যভাষাসহ সেখানকার মানুষের জীবনের ছবি পাওয়া যায় তাঁর সাহিত্যে।

হিন্দী ও ইংরেজি ভাষাতেও প্রকাশিত হয়েছে তাঁর কয়েকটি গ্রন্থ।

দীর্ঘদিন থেকে কিডনির অসুখে ভুগছিলেন তিনি। কিন্তু অসুস্থ অবস্থাতেও সমানে চালিয়ে গেছেন তাঁর সাহিত্যকর্ম, ‘তূর্য’ পত্রিকার সম্পাদনা ও অন্যান্য কাজ। মানুষের প্রতি আন্তরিক ব্যবহার ছিল তাঁর চরিত্রের একটি উজ্জ্বল দিক।

প্রথম প্রকাশিত উপন্যাস ‘নুনবাড়ি’ এবং গল্প-সঙ্কলন ‘কাক’ থেকেই তাঁর স্বাতন্ত্র্যচিহ্নিত সাহিত্য-পথের যাত্রাশুরু৷‌ যে যাত্রাপথে জীবনের বিস্তৃত পরিসর, মানসিক টানাপোড়েন, খুঁটিনাটি উঠে এসেছে বারবার৷‌ ষাটেরও বেশি বইয়ের রচয়িতা এই সাহিত্যিক তাঁর ‘অনম্ত দ্রাঘিমা’-র জন্য পেয়েছেন বঙ্কিম পুরস্কার৷‌ ঔপন্যাসিক ও গল্পকার পরিচয়ের আড়ালে প্রয়াত সাহিত্যিকের ছিল এক কবি-মন৷‌ কবিতা ছিল তাঁর প্রথম প্রেম৷‌ কবিতার জন্য পেয়েছেন ‘আকাশ সাহিত্য পুরস্কার’ এবং ‘কবি নিত্যানন্দ পুরস্কার’৷‌ কথাসাহিত্যে বিশেষ অবদানের জন্য পেয়েছেন সোমেন চন্দ পুরস্কার, তারাশঙ্কর পুরস্কার, মাইকেল মধুসূদন পুরস্কার, তিস্তা-তোর্সা সম্মান-সহ একাধিক পুরস্কার ও সম্মান৷‌ তাঁর পরিচিত গল্প-উপন্যাসের মধ্যে রয়েছে ‘পরীযান ও অন্যান্য গল্প’, ‘ভারতবর্ষ’, ‘কামকুঠিয়া’, ‘ফুলপরী’, ‘জন্মদাগ’, ‘নীল দুঃখের ছবি’, ‘সামনে সাগর’, ‘দৌড়বোগাড়ার উপাখ্যান’, ‘বনবাসী’, ‘জার্মানের মা’, ‘লোধগ্রামে সূর্যোদয়’ প্রভৃতি৷‌

তাঁর কিছু বইঃ
O- পলাশ বিশ্বাস