জানিনা,কথা হয়নি নবারুণদার সনে কি তিনি কি আদৌ জানতেন
জানিনা,কথা হয়নি নবারুণদার সনে কি তিনি কি আদৌ জানতেন
আমরা উদ্বাস্তুরাও আসলে ফ্যাতাড়ুদের দলে?
সবিতাবাবুর চাই সেই হারানো ডুরে সাড়ি
ডুরে বাঘ তবু আছে
মহানগরে ডুবে আছি
হারিয়ে গেছে ভালোবাসার সেই আঁচল
সেই ডুরে সাড়ির বন্যা
পলাশ বিশ্বাস
প্রসঙ্গঃএই সময়ে প্রকাশিত লেখা-এরাও উদ্বাস্তু,যাদের নোবেল পুরস্কার বিজয়িনী সু চি পর্যন্ত মানুষ মনে করেননি,সেই রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠির উদ্বাস্তু কাহিনী
১৯৯১-৯২ সালে আড়াই লক্ষাধিক মুসলিমরোহিঙ্গা শরণার্থী বার্মার (বর্তমান: মায়ানমার) সামরিক জান্তার নির্যাতন-নিপীড়ন থেকে মুক্তি পেতে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। তাদের অনেকেই বিশ বছর যাবৎ বাংলাদেশে অবস্থান করছে।সেই উদ্বাস্তু ঢল বয়েই চলেছে।সারা পৃথীবী তোলপাড়।ভারতবর্ষের তা নিয়ে মাথাব্যথা নেই।বাংলায় বাঙালি উদ্বাস্তুরা ব্রাত্য,অন্ত্যজ,অছুত,তাঁদের তাড়ানোর সবরকম অভিযান ব্যর্থ,পশ্চিম বঙ্গের বাঙাল যন্ত্রণা অসহনীয়।
দন্ডকারণ্যে,আন্দামানে,নৈনীতালে,অসমে ত্রিপুরাতে, রাজস্থানে, ইউপিতে,বিহারে ,ঝাড়খন্ডে- ভারতবর্ষের রাজ্যে রাজ্যে তাংরা রক্তবীজের মত ছড়িয়ে,ছিটিয়ে।
তাঁদের নাগরিকত্ব আছে আবার নাগরিকত্ভ নেই।
তাঁদের পরিচয় আছে।আবার পরিচয় নেই।
তাঁদের পুনর্বাসন হয়েছে যতটা,উত্খাত বেদখলী হয়েছে অনেক গুণ বেশি।আদৌ পুনর্বাসন হয়নি,তার চেয়ে শতগুণ বেশি।
তারাও যাদের পুনর্বাসন হয়নি,ছড়িয়ে ছিটিয়ে বাংলাদেশি পরিচয়ে অবান্ছিত বেনাগরিক।উদ্বাস্তু বা শরণার্থী বা মানুষ,তাদের পরিচয় কোনোটাই নয়।তারা আবার এই পশ্চিম বাংলায় রেলে লাইন ,খালধার, বিল ধার,শ্মশান ঘাট,ফুটপথ,ব্রিজের তলা,অরণ্যভূমি,খাস জমি দখল করে বাংলার জলজমি জঙ্গলে আগাছার মত বেঁচে আছে।অবান্ছিত।
ভিনরাজ্য থেকে দলে দলে তারা কখনো কখনো বর্গিদের মত হানা দেয় কখনো কখনো।বুঝেও বোঝে না,সেই মরিচঝাঁপির রক্তলেখা,আগুনের উত্সব,নৌকাডুবি,পুলিশ ফাযরিং,নিস্পাপ শিশুদের দরিয়ায় ভাসান,নারী মাংসের কুটির শিল্প ও অবিরাম ধর্ষণেও তারা বাঙালি।
তাঁদের ইতিহাসে নাম লেখা হয়নি।
তাঁরা আজও বাস্তুহারা।
তাঁরা আজও ছিন্নমূল।
তাঁরা আজও অস্পৃশ্য,ব্রাত্যজন।
তাঁরা অবান্ছিত।
তাঁরা দেশ ভাগের সত্তর বছর পরও শুধু ইস্ট বেঙ্গল।
তাঁরা আগা থেকে গোড়া আজও বাঙাল।
ভদ্রলোক সাজলেও বাদাবন,নদী নালার গন্ধ তাঁদের রয়ে গেছে।
এসচি,বসলুম বললেও বাঙাল টান ঘোচে নি,বাঙাল টান মোছে নি।
শুধু হারিয়ে গেছে হিন্দু মুসলিম নিরপেক্ষ সেই ভালোবাসার আঁচল,সেই ডুরে সাড়ি,যা গাঁয়ে গ্রামে টিকে থাকলেও থাকতে পারে,শহরান্চলে এবং শিল্পান্চলে ডুরে সাড়ির ঠাঁই নাই নাই।
গ্রাম বাংলা কতটা বেঁচে আছে,জসিম কবির লেখার মত সেই গ্রামবাংলা,জীবনানন্দের সেই আলক্ষেত,ডিএল রায়ের সেই সকল দেশের রানি বেঁচে আছে কি নেই,সাবআলটার্ণ বিজ্ঞানীদির কি মতামত,মহানগরের জীবন জীবিকায় নিমগ্ন আমার জানার কথা নয়।
তবু সবিতাবাবুর চাই সেই হারানো ডুরে সাড়ি!
ডুরে বাঘ তবু আছে!
মহানগরে ডুবে আছি!
হারিয়ে গেছে ভালোবাসার সেই আঁচল!
সেই ডুরে সাড়ির বন্যা!
তবু মন পড়ে থাকে সেই পিছনে ফেলে আসা নৈনিতালের উদ্বাস্তু উপনিবেশে।দিনেশপুরে।আমার গ্রম বাসন্তীপুরে।
যেখানে জনম ইস্তক সেই ডুরে সাড়ির বন্যা দেখেছি।
লালপেড়ে সাড়ি।
ডূরে সাড়ি।
বিধবার সাদা থান।
উদ্বাস্তু জীবনের সাড়ি কাহিনীর ইতিকথা ইহা ব্যাতিরেক দেখিনি পন্চাশ ষাটের এমনকি সত্তর দশকেও।
বাংলায় বাবার হাত ধরে এসেছিলাম হাইস্কূল পেরিয়ে যখন,তখনো সত্তর দশকের রমরমা।তখনও নক্সাল বেঁচে ছিল।
তখনো বঙ্গশ্রী,সুলেখা,জেসপের রমরমা ছিল।
ছাপান্ন হাজার কল কারখানা তখনো বন্ধ হয়নি।
লে আফ,লকআউট আমদানি হয়নি।
ভিআরআরএস,ডিসিনভেস্টমেন্ট অনেক পরের গল্প।
তখনো চাবাগানের খুশবু ছিল বাংলা থেকে তমাম ভারত মুলুকে।তখনো চাবাগানে মৃত্যুমিছিল শুরু হয়নি।
তখনো ব জুটমিল শ্মশান হয়ে যায়নি।
তখনো সমস্ত ট্রেন যাত্রার অভিমুখ কোলকাতা ছিল।
বাবা আমায় কোলকাতা দেখাতে নিয়ে গিযে সবার আগে হেঁটে কেওড়াতলা মহাশ্মশানে নিয়ে গিয়ে ছিলেন।
দেখে ছিলাম সেই শাশ্বত স্মৃতি ফলক জীবনে প্রথমবারঃ
তিষ্ঠ ক্ষণকাল!
সেই কেওড়াতলার মহাশ্মশানে ঘুমিয়ে আছে আমাদের বরাত্যজনের,অন্তজদের ফ্যাতাড়ুদের গোরিলা মহানায়ক
নবারুণ ভট্টাচার্য!
সেই কেওড়াতলার মহাশ্মশানে বাবা একদিন পূর্ব বাংলার বাস্তুহারা ছিন্নমূলদের পুনর্বাসনের দাবিতে মাইকেলের সমাধিস্থলে আমরণ অনশনে বসেছিলেন এবং তার কমরেড,তার নেতা তাঁকে এবং তাঁর সঙ্গী সাথিদের বাংলা ছাড়া করেছিলেন!
সেই তাঁরা সেইদিন ফ্যালানির মত কাঁটাতারে বিদ্ধ হয়ে থাকল সারা জীবন এবং আমি তাঁদের হৃদপিন্ডের অবিরাম রক্তপাতের মধ্যে ঔ ডুরে সাড়ির ভালোবাসার বন্যায় মানুষ হয়েছি তাঁদের গড়া উপনিবেশে!
তাঁরা ঔ নেনীতালে গড়ে তুলেছিল তাঁদের সকল দেশে রানি বাংলাদেশ!
তাঁরা মরিচঝাঁপিতেও ফিরে আসেনি!
তবু আমি এসেছি!
ফিরে আসিনি আদৌ!
আমি ত আদৌ ছিলাম না!
না পুবে ছিলাম,না পশ্চিমে!
পুব পশ্চিম ত সুনীল গাঙ্গুলির ছিল!
আমি ত উত্তর এবং উত্তরকালের মানুষ!
জীবিকার প্রয়োজনে হাওড়া ইস্টিশানটা দেখা হল!
দেখা হল শেযালদা!
ওয়ারনা আমি সেই রোহিঙ্গা মুসলমান উদ্বাস্তু.যারা আছে,আবার নেই!
বাংলার বালডা ছেঁড়া যায়না!
উদ্বাস্তুরা আছে না না আছে,কেমনে আছে.তাঁদের মন আছে কি দেহটই সার,পশ্চিম বাংলার বালডাও ছেঁড়া যায় না!
ভিন রাজ্যের বাঙালিরা আছে কি নেই,তাঁরা মানুষ হয়ে আছে না,অমানুষ হয়ে আছে,ভদ্রলোক বর্ণহিন্দু পশ্চিম বাংলার বালডাও ছেঁড়া যায় না!
তবু কলকাতা তখনো কোলকাতা ছিল।
তবু কোলকাতায় কোমলগান্ধারের ,নবান্নের গন্ধ ছিল।
মিছিলের মহানগর তখনো মিছিলের মহানগর ছিলো।
তখনো যখন বাবার হাত ধরে মাইকেলের সমাধিস্থলে দাঁড়িয়েছিলাম সেখানেই,যেখানে আমাদের নবারুণদা বিশ্রামে আছেন আগামী যুদ্ধের প্রস্তুতি।নবারুণদাও তে বিজন ভট্টাচার্যের ছেলে।
জানিনা,কথা হয়নি নবারুণদার সনে কি তিনি কি আদৌ জানতেন
আমরা উদ্বাস্তুরাও আসলে ফ্যাতাড়ুদের দলে?


