শরদিন্দু উদ্দীপন
দুর্গাপূজা না নরমেধ যজ্ঞ
অসুরদের কাছে বেধড়ক মার খেয়ে স্বর্গ থেকে বিতাড়িত হওয়ার কাহিনী আর্যদের প্রতিটি গ্রন্থেই ক্ষোভের সাথে উল্লেখ আছে। এই স্বর্গে কি এমন মধুক্ষরা ঢালাও ব্যবস্থাপনা ছিল যে সেখান থেকে অপমানিত হয়ে বন বাদাড়ে ঘুরে বেড়ানোর গ্লানি আর্যরা কিছুতেই ভুলতে পারেনা? এবং যার জন্যে এই ভূদেবতারা রাশিকৃত বাইয়ের পাহাড় তৈরি করে তাদের জিঘাংসাকে ব্যক্ত করেছে। ক্ষোভ উজাড়া করে দিয়েছে এবং অসুরদের নিধন করার জন্য অস্ত্র-শস্ত্র, ধর্ম-অধর্ম; অন্যায়-অপকর্ম এবং দুষ্কর্মের পথ গ্রহণ করতে কার্পণ্য করেনি! এই আজগুবি গাঁজাখুরি মাইথলজির চরিত্রগুলিকে ঐতিহাসিক চরিত্র বলে জণমানসের মধ্যে সঞ্চালিত করে দেবার মধ্যে কী এমন গূঢ়ার্থ রয়েছে যে এগুলি না থাকলে ভূদেবতারা অপাংক্তেয় হয়ে পড়বে বলে আশঙ্কা বোধ করছে! এই চালিয়াতি, ধাপ্পাবাজি ও চালাকিগুলি কালে মিথ্যে বলে প্রমানিত হওয়ার ঝুঁকি থাকা সত্যেও কেন তারা পাহাড় প্রমান পুঁথি তৈরি করে করে নিজেদের চৌর্য বৃত্তি, লাম্পট্য ও নীতিহীনতা লিপিবদ্ধ করে রাখল তার মূল রহস্য জানা দরকার। এই রহস্য উদ্ঘাটন করতে পারলেই বোধহয় দেবাসুরের মৌলিক লড়াই এবং নিরন্তর দ্বন্দ্বের রহস্যভেদ করা সম্ভব হবে।
স্বর্গ কোথায়?
ভুদেবতাদের বর্ণনা অনুসারে স্বর্গের অবস্থানটা বেশ হেঁয়ালি পূর্ণ।কিন্তু তারা প্রতিনিয়ত দাবী করেছে স্বর্গই দেবতাদের আদি নিবাস। তাদের পিতৃভূমি। যেখান থেকে দেবতারা তিন ভূবনের কোথায় কি হচ্ছে দেখতে পায়। যেখানে কোনদিন রাত হয় না। সহস্র সূর্য আলোকিত করে রাখে। কিন্নরীদের নুপুর নিক্কন আর অনন্ত যৌবনা অপ্সরাদের দেহ মধু ভাণ্ড পান করে গন্ধর্ব, কিন্নর ও দেবতারা যেখানে অন্তহীন সুখ ভোগ করতে থাকে। দেবতাদের কাঙ্ক্ষিত এই অমর লোকের হদিস পেতে হলে ঋক বেদের দশম মণ্ডলের পুরুষ সূক্তের ৯০ শ্লোক থেকে খুঁজতে হবে। এতে বলা হয়েছে ঃ
- পুরুষ নিজেই হল সমস্ত বিশ্ব। তিনি অমর জগতের প্রভু ...
- এই পুরুষকে উৎসর্গ করে দেবতারা যখন যজ্ঞ করলেন তখন বসন্ত ছিল তার মাখন, গ্রীষ্ম হল তার আগুন এবং শরৎ হল তার নৈবেদ্য।
- এই পুরুষকে দেবতারা ঘাসের উপর বলি দিলেন। ব্রাহ্মণ হল তার মুখ, রাজন্য হল তার বাহু, বৈশ্য হল তার উরু এবং পায়ের থেকে সৃষ্ট হল শূদ্র।
- নাভি থেকে উঠে এল বাতাস, মাথা থেকে আকাশ, পা থেকে পৃথিবী, কান থেকে চতুর্দিক।
- দেবতারা আকাশকে স্বর্গ ও পৃথিবীর মাঝখানে স্থাপন করলেন।
মনু সংযোজন করলেন, “স্বয়ম্ভু জীব সৃষ্টি করার জন্য প্রথমে জল ও তার মধ্যে বীজ (বীর্য) প্রথিত করলেন। সেটা ডিমের আকার নিল। এই ডিমের থেকে ব্রহ্মা জন্ম নিল। এই ডিম দুই ভাগে ভাগ হল। এক ভাগ হল স্বর্গ এবং অন্য ভাগ হল পৃথিবী। এই দুইয়ের মাঝখানে আকাশকে স্থাপন করা হল। অর্থাৎ বেদের দশম মণ্ডল ও মনুর সংযোজনের মধ্যে স্বর্গ ও পৃথিবীর অবস্থান নিয়ে একটি সাযুজ্য আমারা দেখতে পাচ্ছি। কিন্তু পরবর্তী কালের রচিত পুরাণ, শ্রুতি শাস্ত্র, রামায়ন, মহাভারত ইত্যাদি গ্রন্থগুলির বর্ণনা শুনে মনে হতে পারে যে স্বর্গটা হিমালয়ের কোন একটি অঞ্চল হবে। কৈলাস পাহাড়ের আসে পাসে কোন এলাকা, অথবা মানস সরোবরের সন্নিকটে অপূর্ব সুন্দর কোন এক বিস্তীর্ণ অঞ্চল। মহাভারতের পঞ্চ পান্ডব তো পায়ে হেঁটেই স্বর্গে পৌঁছে যাবার বন্দোবস্ত করেছিল। ধন্ধটা বেস মজাদার। যদি আমারা জায়গাটাকে হিমালয়ের কৈলাসের আশেপাশের কোন এলাকা ধরি তবে বেজায় ফ্যাসাদে পড়ে যেতে হবে। কেননা আর্যদের আসার বহুকাল আগেই এ অঞ্চল প্রোটো অস্ট্রাল ও মঙ্গোলয়েড মানুষের দখলে এসে গেছে। আবার যদি আকাশের ওপারের কোন জায়গা ধরি যে, সেখানে গিয়ে অসুরেরা দেবতাদের ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করে দিয়েছিল; এটা বড় বেমানান লাগবে এবং ভীষণ হাস্যরসের উপাদান জোগাবে। এবং এই হাস্যরস শেষ পর্যন্ত নিজেদের অশিক্ষিত ও অসভ্য হিসেবে প্রতিপাদিত করবে।
তবে দেবতারা স্বর্গ প্রাপ্তির জন্য এত লালায়িত কেন? কি এমন আলাদা রসনালয় এই স্বর্গ?
এ হেঁয়ালির খানিকটা লিখিত উপাদন জোগাতে পারে অসিরিয় সভ্যতার অসুর নগরী। সম্রাট অসুর বাণী পালের লাইব্রেরীতে প্রাপ্ত ২৫০০০ ক্লেটেবলেটস । পৃথিবীর সর্ব প্রাচীন এই লাইব্রেরী থেকে জানা যায় যে, একদিকে অসুর নগরী যেমন শিল্প সভ্যতা ও স্থাপত্যে সর্বোচ্চতা লাভ করেছিল; অন্যদিকে এর তাক লাগিয়ে দেওয়া বৈভব বহু দস্যু, লুঠেরাদের আক্রমণ করার জন্য প্রলুব্ধ করেছিল। বাইবেলের কাল শুরু হওয়ার বহু আগেই এই অসুর নগরী সুখ্যাত ছিল। বাইবেলের old Testament-এর শুরুতে এই নগরী উল্লেখ করেছে।

“A river watering the garden flowed from EDEN, and from there it divided, had four head streams …….The name of the third is the Tigris, it runs along the east of ASSUR. And the fourth river is the Euphrates”

. ...Genesis, Old Testament, Holly Bible.
এখনে অনেক টা কাজ বাকি আছে। মেসোপটেমিয়ার ইতিহাসটি দিতে হবে।
ইউফ্রেটিস ও টাইগ্রিস নদী দ্বয়ের মাঝে অবস্থিত অঞ্চলে গড়ে উঠেছিল সুমহান অসুর সভ্যতা বা আসিরিয়ান সভ্যতা। দক্ষিনের অংশটি সুমের বা সুমের-আক্কাদ । গ্রীক লেখকেরা এই সভ্যতাকে মেসোপটেমিয়া হিসেবে উল্লেখ করেছেন। মেসোপটেমিয়া কথার অর্থ হল দুই নদীর মধ্যবর্তী দেশ। এই দেশের রাজধানী "অসুর" তাদের সুমহান ঈশ্বরের নামে পরিচিত ছিল। নিনেভ শহর ছিল উন্নত অসুর সভ্যতার প্রাণকেন্দ্র একটি জাঁকজমক পূর্ণ শহর।আর মেহেরগড়, হড়প্পা ও মহেঞ্জোদড়ো ছিল এই সুউন্নত অসুর সভ্যতার সহ নাগরিক , যাদের যৌথ প্রচেষ্টায় গড়ে গড়ে উঠেছিল সম্মিলিত রাষ্ট্রপুঞ্জের ভাবনা।
অসুর রাজারা ছিলেন প্রজ্ঞাবান ও ন্যায় পরায়ণ। একদিকে তারা ছিলেন প্রজাবৎসল কিন্তু অন্যায়কারীদের কাছে বিভীষিকা। নিষ্ঠুর ও একরোখা। ক্লটেবলেটস ও পরবর্তী কালের জেন্দাবেস্তায় অসৎ অন্যায়কারী ও দুশ্চরিত্রদের আরিয়াম্যান-বারিয়্যাম্যান (“বার‍্যুয়া” শব্দটি এখনো চন্ডালী ভাষায় দুশ্চরিত্রকে বোঝায়) হিসেবে বর্ণনা করা হয়। এই সকল অকর্মা, অসৎ অন্যায়কারী ও দুশ্চরিত্র আরিয়াম্যান-বারিয়্যাম্যানদের নির্বাসন দেওয়াই ছিল অসুর নগরীর বিধান। অসুর রাজারা এদের কঠোর হাতে দমন করেছে এবং নির্বাসন দন্ড দিয়ে বিতাড়িত করেছে দূরে। কিন্তু সম্পত্তি লুন্ঠন ও লাম্পট্ট বজায় রাখার জন্যই আরিয়াম্যান-বারিয়্যাম্যানেরা সংগঠিত ভাবে বহুবার অসুর নগরী আক্রমণ করছে, নগর ধ্বংস করেছে, পুরুষদের খুন করেছে এবং মহিলাদের বন্দী করে দুর্গে নিয়ে গেছে। যথেচ্ছ যৌনাচার চালানো হয়েছে তাদের উপর। লুণ্ঠন করা সম্পদ, নারী ও সুরার এই ত্রয়ী সমন্বয়ে দুর্গ হয়ে উঠেছে স্বর্গের ছাউনি। অন্তহীন সুখসাগর। আর এই প্রক্রিয়ার মধ্যেই আরিয়াম্যান-বারিয়্যাম্যানদের ধর্ম, অর্থ, কাম ও মোক্ষের ভাবনা তাদের জীবন দর্শণের মধ্যে চিরস্থায়ী ভাবে প্রথিত হয়ে গেছে।
আরিয়াম্যান-বারিয়্যাম্যানদের এরকম একটি আক্রমণের প্রেক্ষাপ্ট ঐতিহাসিক গুস্তাভ তুলে ধরেছেনঃ

“About 2500 B.C. the Accaddian dybasty had reigned for long period in Babylon the Aryans invaded Chaldia and pressing at the same time on the Kannanites of the Persian Gulf and Dravidian in Persia, drove the formers towards North-west and the later to the South-East of India”. Dr. BR Ambedkar, W &S-Vol-12 P. 14.

Contd……………..