ব্লগার হত্যা নিয়ে কিছু কথা
ব্লগার হত্যা নিয়ে কিছু কথা
The story demands that we should not create opportunity for fundamental elements!
Palash Biswas
ব্লগার হত্যা নিয়ে কিছু কথা
ড. ফেরদৌস আহমদ কোরেশী | প্রকাশ : ১৭ সেপ্টেম্বর ২০১৫
ইন্টারনেটে যারা লেখালেখি করেন এক অর্থে তারা সবাই ব্লগার। কারও মনে প্রশ্ন জাগতে পারে, ইন্টারনেটে লেখালেখির জন্য কেউ হত্যাকারীদের টার্গেট হবে কেন?
ইন্টারনেট সর্বস্তরের মানুষকে নিজের মনের কথা অন্যদের সামনে তুলে ধরার এক অভাবিত সুযোগ উপহার দিয়েছে। সভায় বক্তৃতা দেয়ার সুযোগ সবার হয় না, কাগজে লেখার সুযোগ আরও সীমিত। কিন্তু ইন্টারনেট সবার জন্য উন্মুক্ত। যে কেউ তার যে কোনো বক্তব্য-মন্তব্য ইন্টারনেটের মাধ্যমে দুনিয়াজুড়ে ছড়িয়ে দিতে পারেন।
ইন্টারনেটের এই সুযোগের অপব্যবহার করে কিছু ব্যক্তি নিত্যদিন ইসলামের নবী হজরত মোহাম্মদ (দ.) সম্পর্কে অশ্রাব্য ও অকথ্য মন্তব্য করে থাকেন। এ ধরনের ব্যক্তিই তাদের প্রতিপক্ষের টার্গেট হচ্ছে। তাদের লেখালেখিকে কেন্দ্র করেই যত অঘটন ঘটছে।
সব ধর্মের মানুষের মধ্যেই গোঁড়া বা মৌলবাদী অংশ আছে। যারা বিশ্বাস করে, কেবল তাদের ধর্মই ঐশী, বা ঈশ্বর প্রেরিত। অতএব তা প্রশ্নের অতীত। মুসলমান, খ্রিস্টান, ইহুদি, হিন্দু, বৌদ্ধ- সবার ক্ষেত্রেই তা প্রযোজ্য। এই গোঁড়া ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে আবার একটি অতি-উগ্র ও অসহিষ্ণু অংশ থাকে যারা তাদের ধর্ম বা ধর্মপ্রবক্তার বিরুদ্ধে কোনো সমালোচনা শুনতে নারাজ। অতএব কেউ যদি তাদের নবী-রাসূলের বিরুদ্ধে বিদ্রুপাত্মক বা আক্রমণাত্মক কথা বলে- তাহলে তারা ক্ষিপ্ত হয়ে হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে পড়বে, সেটা মোটেই অস্বাভাবিক নয়।
এমনিতেই তো ধর্মে ধর্মে মারামারি, খুনোখুনি- শতাব্দীর পর শতাব্দী চলে আসছে। সেক্ষেত্রে ইন্টারনেট বা বইপত্রের লেখালেখি দিয়ে কারও ধর্মানুভূতিতে বারংবার আঘাত করার পরিণতি যে সংঘাতের উদ্ভব ঘটাতে পারে, তা কি বলার অপেক্ষা রাখে?
২.
ভারতের রাষ্ট্রীয় খেতাবপ্রাপ্ত (পদ্মবিভূষণ) বিশ্বনন্দিত শিল্পী মকবুল ফিদা হুসেন (The barefoot 'Picasso of Indian art')। তিনি এক দেবীর নগ্ন চিত্র এঁকে তাতে এক সুন্দরী চিত্রাভিনেত্রীর মুখমণ্ডল স্থাপন করে শিল্প রসিকদের হাততালি কুড়িয়েছেন। কিন্তু ভারতজুড়ে হিন্দুত্ববাদ ফুঁসে উঠল। তার বিরুদ্ধে কয়েকশ মামলা করা হয় ভারতের বিভিন্ন আদালতে। গ্রেফতারি পরোয়ানাও জারি হয়। হত্যার হুমকি আসতে থাকে চারদিক থেকে। অগত্যা প্রাণ বাঁচানোর জন্য দেশ ছেড়ে পালাতে হয় ফিদা হুসেনকে।
হিন্দু দেবীমূর্তিতে বস্ত্র স্বল্পতা নতুন কিছু নয় (হিন্দু শিল্পীরাও দীর্ঘকাল ধরে নগ্ন দেবীমূর্তি এঁকে এসেছেন- ইন্টারন্যাশনাল হেরাল্ড ট্রিবিউন-এ সলিল ত্রিপাঠী)। দেবীমূর্তিতে চিত্রাভিনেত্রীর মুখমণ্ডল স্থাপনের ব্যাপারটাও নতুন নয়। একাত্তরে কলকাতায় পূজার মৌসুমে বিভিন্ন পূজামণ্ডপে ঘুরে বেড়িয়েছি বন্ধুদের সঙ্গে। একাধিক পূজামণ্ডপের দেবীমূর্তিতে বাংলাদেশের তৎকালীন জনপ্রিয় অভিনেত্রী ববিতা ও শাবানার মুখচ্ছবি দেখেছি। তাতে পূজারিদের পূজার কোনো অসুবিধা হয়নি। দেবীর মুখমণ্ডলে মুসলমান নায়িকার মুখচ্ছবিও কোনো সমস্যা সৃষ্টি করেনি। কিন্তু সমস্যা হয়ে গেল ফিদা হুসেনের ক্ষেত্রে। কারণ তিনি ছিলেন মুসলমান। নামে মাত্র যদিও।
২০০৬ সালের দিকে হায়দরাবাদে নতুন করে গড়ে ওঠা এক আবাসিক এলাকায় ঘুরে বেড়ানোর সময় একটি দৃষ্টিনন্দন নবনির্মিত বাড়ির পাশ দিয়ে যেতে যেতে আপন মনে বলে উঠেছিলাম- বাহ্, বাড়িটা তো খুব সুন্দর! আমার পথপ্রদর্শক বন্ধু গুরমিত সিং মৃদু হেসে বললেন, বাড়িটা কার জানো? মকবুল ফিদা হুসেনের। নিজে সবকিছু পছন্দ করে কাজ করিয়েছে। কিন্তু বেচারার এই বাড়িতে কখনও থাকা হবে কি-না বলা যাচ্ছে না। ওই সময় ফিদা হুসেনকে বজরং-শিবসেনা গোষ্ঠীর হামলা-মামলার মুখে ভারত ছেড়ে উপসাগরীয় দেশ দোহায় আশ্রয় নিতে হয়। সত্যিই তার আর দেশে ফেরা হয়নি। ২০১১ সালে ৯৫ বছর বয়সে তিনি লন্ডনে মৃত্যুবরণ করেন।
শিল্পকর্মের ক্ষেত্রে স্বাধীনতার পরিসর কিছু বড়। অজন্তা-ইলোরার দেয়াল চিত্রকে ভালগার বলা হয় না। তবে এক্ষেত্রে আমি ভারতের প্রখ্যাত শিল্পী মুম্বাই আর্ট সোসাইটির সাবেক সভাপতি গোপাল আদিবরেকারের সঙ্গে একমত হব : 'Nothing is bad in being creative, but the artist should not go for such artwork, which may hurt the sentiments of a segment of society'।
মুসলমান না হয়ে হিন্দু হলেই হুসেন রক্ষা পেতেন, তা বলা যায় না। শুনেছি কলকাতার জনপ্রিয় সাহিত্যিক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ও কিছুটা অনুরূপ সমস্যায় পড়েছিলেন (তিনি নাকি তার এক গল্পে পূজামণ্ডপের পাশে ঝোপের আড়ালে দাঁড়িয়ে নগ্নপ্রায় দেবীমূর্তির দিকে তাকিয়ে কতিপয় যুবকের দুষ্টুমীর বর্ণনা লিখে হিন্দু মৌলবাদীদের হামলার শিকার হয়েছিলেন)।
খ্রিস্টান ও ইহুদিদের ক্ষেত্রেও একই চিত্র। ইহুদিরা তো তাদের ধর্ম নিয়ে কথা বলায় যিশুকে ক্রুশবিদ্ধ করে হত্যা করে। খ্রিস্টানরা তাদের গির্জার কিছু অনুশাসন নিয়ে কথা তোলার অপরাধে অনেক পাদ্রী সাহেবকে পুড়িয়ে মেরেছে। জীব হত্যা মহাপাপ অহিংস নীতির পূজারি, মহামতি বুদ্ধের অনুসারীরাও এই সেদিন মিয়ানমারে ভিন্নধর্মাবলম্বী মানুষকে নির্মম ও নৃশংসভাবে হত্যা করেছে।
এটাই যেখানে বিশ্বজনীন পরিস্থিতি- সেখানে এই ৯৩ ভাগ মুসলমানের দেশে কিছু ব্যক্তি ইসলাম ও মহানবীর বিরুদ্ধে ইন্টারনেটে নিরন্তর কুৎসা রটনায় লিপ্ত। এ নিয়ে একাধিক মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে যাওয়ার পরও তারা ক্ষান্ত হচ্ছে না। এ থেকে বুঝতে হবে তাদের বিশেষ কোনো মিশন আছে। তারা বুঝেশুনেই এই কাজ করছে এবং নিশ্চিতরূপেই কোনো বিশেষ গোষ্ঠী বিশেষ কোনো উদ্দেশ্যে তাদের দিয়ে এ কাজ করাচ্ছে।
৩.
দীর্ঘদিন ধরে লক্ষ্য করে আসছি পশ্চিমের একটি সংঘবদ্ধ গোষ্ঠী তাদের কথিত Hate Islam Campaign-এর অংশ হিসেবে ইন্টারনেটে ইসলামের মহানবীকে নিয়ে এমনসব কথাবার্তা লিখে থাকে যা কোনো ভদ্র মানুষ মুখে উচ্চারণ করতে পারেন না। লিখে তো নয়-ই। কেবল স্বঘোষিত Islamophobe রবার্ট স্পেন্সারের Jihad Watch বা Islam Watch ওয়েবসাইটই নয়, এরকম শতাধিক ওয়েবসাইট ইসলামের বিরুদ্ধে অপপ্রচারে লিপ্ত রয়েছে। এসব সাইটে ইসলাম সম্পর্কে অসত্য ও বিভ্রান্তিকর তথ্য পরিবেশন করার জন্য ভাড়াটে লেখকদের কাজে লাগানো হয়। এই Hate Islam Campaign-এ অর্থায়নকারী অনেক ইহুদি ও খ্রিস্টান সংস্থা রয়েছে। Horowitz Foundation তার অন্যতম।
ইসলামের অনেক বিষয় নিয়ে ইসলামী পণ্ডিতদের মধ্যেই মতভেদ আছে। অনেক হাদিসের সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। ইতিহাস ও গালগপ্পো অনেক ক্ষেত্রে একাকার হয়ে গেছে। সেসব নিয়ে খ্রিস্টান পণ্ডিতদের লেখালেখির সীমা-চৌহদ্দি নেই। তাতে কট্টর মুসলমানরা নিঃসন্দেহে নাখোশ।
যে ধরনের লেখালেখির কারণে সাম্প্রতিককালে বাংলাদেশে খুন-জখম-হত্যাকাণ্ড ঘটেছে- এই তথাকথিত ব্লগারদের লেখালেখি- তাতে না আছে কোনো শিল্পরস, না কোনো তাত্ত্বিক বিতর্ক। আছে কেবল ইসলাম ও হজরত মোহাম্মদ (দ.)-কে হেয় করার প্রয়াস। নানা কুরুচিপূর্ণ কল্পকাহিনী ও কার্টুন। পর্নোগ্রাফি তার কাছে নস্যি। এর একটাই উদ্দেশ্য হতে পারে- উসকানি দিয়ে পাগল ক্ষেপিয়ে অনাসৃষ্টি কাণ্ড ঘটানো। এটা বাংলাদেশকে ধর্মান্ধ জঙ্গি রাষ্ট্র হিসেবে চিহ্নিত করার সুপরিকল্পিত দুরভিসন্ধির অংশ ছাড়া আর কিছুই নয়।
যারা এ ধরনের কর্মকাণ্ডকে বাক-স্বাধীনতা বা ব্যক্তি-স্বাধীনতার নামে সমর্থন করেন, কিংবা কথিত ব্লগারদের পক্ষে রাস্তায় নামেন, বা কলম ধরেন, তাদের যথার্থ মুক্তমনা হতে এসব বিষয় বিবেচনায় নিতে আহ্বান জানাই। আমার বরাবরের সন্দেহ, তাদের অনেকে এসব নোংরা লেখালেখি আদৌ পড়ে দেখেননি। দু-একজনকে জিজ্ঞাসা করার পর তারা অকপটে তা স্বীকার করেছেন। এমন এক ঘনিষ্ঠজনকে কানে কানে দু-একটি বাক্য শোনানোর পর তিনি নিজেই কানে হাত দিয়ে বললেন, থাক, থাক, আর বলবেন না!
খরগোশকেও ক্রমাগত খোঁচাতে থাকলে ফোঁস করে ওঠে, খামচি দেয়। নবী-রাসূলের নামে কটূক্তি শুনে কোনো ধর্মান্ধ ব্যক্তি চাপাতি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়লে তাকেও উসকানির প্রতিক্রিয়া হিসেবে দেখতে হবে। ব্যাপারটা যতই মর্মান্তিক হোক না কেন।
তবে, মনে রাখতে হবে- যে কোনো হত্যাকাণ্ডই দণ্ডনীয় অপরাধ। বিপুল-বিশাল জ্ঞানভাণ্ডার এবং প্রযুক্তি-উৎকর্ষ নিয়েও আমরা এখন পর্র্যন্ত একটি এককোষী অ্যামিবা সৃষ্টি করতে পারিনি। তাই কোনো হত্যাকাণ্ডকেই সমর্থন করা যায় না। সব হত্যাকাণ্ডের অপরাধীকে বিচারে সোপর্দ করা এবং বিচারিক প্রক্রিয়ায় সাজা প্রদান করা রাষ্ট্রের আবশ্যিক কর্তব্য।
৪.
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সেদিন (৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৫) জন্মাষ্টমী উপলক্ষে হিন্দু ধর্মাবলম্বী নেতাদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময়কালে বলেছেন, কারও ধর্মানুভূতিতে আঘাত করা কখনও সহ্য করা হবে না। বলেছেন, ধর্মনিরপেক্ষতা মানে ধর্মহীনতা নয়। আরও বলেছেন, বাংলাদেশে কেউ কারও ধর্মানুভূতিতে আঘাত দিয়ে কথা বলতে পারবে না। কেউ ধর্ম পালন করবেন কী করবেন না এটা তার ব্যাপার। কিন্তু কারও ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দিয়ে কথা বলার অধিকার কারও নেই। আমি প্রধানমন্ত্রীকে তার এই সোজাসাপ্টা বক্তব্যের জন্য ধন্যবাদ জানাচ্ছি।
প্রধানমন্ত্রী কি শুধু হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের আশ্বস্ত করার জন্য এ কথাগুলো বলেছেন? হিন্দুরা এদেশে সংখ্যালঘু। সংখ্যালঘু হওয়ার বিপত্তি অনেক। কেউ যেন তাদের ধর্মানুভূতিতে আঘাত করতে না পারে, তা অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে।
তবে আজকের বাংলাদেশে মনে হয় সেই নিশ্চয়তা সংখ্যালঘুর চেয়েও সংখ্যাগুরু মুসলমানদের জন্য অনেক বেশি জরুরি হয়ে পড়েছে। জানি আমাদের প্রধানমন্ত্রী তার পিতার মতোই ধর্মপ্রাণ। আশা করব কেবল সংখ্যালঘুদের ধর্মানুভূতিতে আঘাতকারীদের বিরুদ্ধেই নয়, বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানের ধর্মানুভূতিতে আঘাতকারীদের বিরুদ্ধেও আমাদের রাষ্ট্র কঠোর ব্যবস্থা নিতে অটল থাকবে।
যাতে করে আগামীতে আবার কোনো তথাকথিত ব্লগার হত্যার সংবাদে সংবাদপত্রের পাতা কলংকিত না হয়।
১৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৫
ড. ফেরদৌস আহমদ কোরেশী : রাজনীতিক, ভূ-রাজনীতি ও উন্নয়ন গবেষক
[email protected]
Copy Paste with courtesy - http://www.jugantor.com/sub-editorial/2015/09/17/325096#sthash.2U6HUyPw.dpuf
Today's Trends
Google.M.F.Husain,Doodle, Twitter,Narendra Modi,Mahendra Singh Dhoni, Virender Sehwag,Adarsh Nagar metro station, Varanasi,Narendra Modi, Insurance, Srinagar, Baramulla district, Baramulla, Film - Media genre, Video – Interest, Instagram, Sania Nehwal, Shah Rukh Khan, Rajasthan, Mining, Ganesh Chaturthi


